২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণ করে। প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পর তাদের কর্মকাণ্ড ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন ও নাগরিক সমাজে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে এই সরকারের দায়িত্ব সমাপ্ত হওয়ার কথা থাকায় তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সরকার শুরু থেকেই তিনটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছিল—রাষ্ট্র ও সংবিধানভিত্তিক কাঠামোগত সংস্কার, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, এই তিন ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে এবং বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তাদের মতে, সংস্কার প্রক্রিয়ায় কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকলেও তা ছিল বিচ্ছিন্ন ও আংশিক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, সংস্কার কমিশন গঠন ও ‘জুলাই সনদ’-এর মতো উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও নীতিনির্ধারণে সমন্বয়ের অভাব ও নির্বাচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সংস্কারের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিচার প্রক্রিয়ায়ও নিরপেক্ষতা বনাম প্রতিশোধের বিতর্ক তৈরি হয়েছে বলে সমালোচকরা মনে করছেন।
বিচার সংক্রান্ত ক্ষেত্রে সরকার কয়েকটি আলোচিত মামলায় অগ্রগতি ও বিচার কার্যক্রম শুরু করাকে বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু সমালোচকদের অভিযোগ, ব্যাপকহারে মামলা দায়ের, বিভিন্ন পেশাজীবীকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এই সরকারের সবচেয়ে সমালোচিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত দেড় বছরে সংবাদমাধ্যম কার্যালয়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, এ সময় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সরকারের ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
অর্থনৈতিক খাতে তুলনামূলক ইতিবাচক প্রবণতার কথা উল্লেখ করছেন অর্থনীতিবিদরা। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মত দিয়েছেন যে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার কিছুটা সফল হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতে সংস্কার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জিত হয়নি—এ বিষয়টি অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরাও স্বীকার করছেন।
সামাজিক পরিসরে নারীর নিরাপত্তা ও সমঅধিকার ইস্যুতে উদ্বেগ বাড়ার কথাও আলোচনায় এসেছে। নারী বিষয়ক সংস্কার উদ্যোগ ঘিরে বিতর্ক এবং সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের ভূমিকা নিয়ে মানবাধিকারকর্মীরা প্রশ্ন তুলেছেন।
অন্যদিকে সরকারের দাবি, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একাধিক বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা, সাংবিধানিক ও নির্বাচনী সংস্কারে অগ্রগতি এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার করা তাদের বড় সাফল্য। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে তারা ‘অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতার জটিলতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিলেও আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তা ও সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পুরোপুরি সফল হয়নি—এমন মতই প্রাধান্য পাচ্ছে বিশ্লেষক মহলে। আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফলই নির্ধারণ করবে এই সরকারের কার্যক্রম ইতিহাসে কীভাবে মূল্যায়িত হবে।

অনলাইন ডেস্ক 








