যুক্তরাষ্ট্রের জানা উচিত—যদি তারা নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু করে, তাহলে এবার সেটি শুধু দ্বিপক্ষীয় থাকবে না; তা পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলী খামেনি
রোববার সকালে (১ ফেব্রুয়ারি) দশ দিনব্যাপী ‘দশে ফজর’ উদযাপনের প্রথম দিনে তেহরানের ইমাম খোমেইনি হুসাইনিয়ায় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে এক বৈঠকে এসব কথা বলেন তিনি।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সতর্ক থাকা—কারণ ওয়াশিংটন যদি নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু করে, তবে তা একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে।
তিনি বলেন, যুদ্ধ, বিমান, যুদ্ধজাহাজ নিয়ে হুমকি দেওয়া আমেরিকানদের জন্য নতুন কিছু নয়। অতীতেও তারা বারবার হুমকি দিয়েছে এবং বলেছে—সব বিকল্প টেবিলে রয়েছে, এমনকি যুদ্ধের বিকল্পও। তবে এসব হুমকিতে ইরানি জনগণ কখনোই প্রভাবিত হয়নি।
ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র কোনো দেশকে আক্রমণ শুরু করবে না—এ কথা স্পষ্ট করে দিয়ে তিনি বলেন, তবে কেউ যদি ইরানের ওপর হামলা চালায়, তাহলে ইরানি জাতি তার কঠোর জবাব দেবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বকে দুইটি বাক্যে সংক্ষেপ করা যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে গ্রাস করতে চায়, আর ইরানের সচেতন জাতি ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র সেই পথের প্রধান বাধা।
তিনি বলেন, গত ৪৭ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের মূল কারণ হলো—ওয়াশিংটনের ইরানের ওপর আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা এবং সেই আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের প্রতিরোধ।
আয়াতুল্লাহ খামেনি স্মরণ করিয়ে দেন, প্রায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমেরিকানরা ইরানে উপস্থিত ছিল। তাদের হাতে ছিল সম্পদ, তেল, রাজনীতি, নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ—সবকিছু। তারা যা খুশি তাই করত। এখন তারা পাহলভি আমলের সেই অবস্থায় ফিরে যেতে চায়। কিন্তু ইরানি জাতি দৃঢ়ভাবে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে।
ইমাম খোমেইনির ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নানা হুমকি সত্ত্বেও সাহসের সঙ্গে ইমাম খোমেইনি তেহরানে প্রবেশ করেছিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে রাজতন্ত্রের অবসানের ঘোষণা দেন। জনগণের ব্যাপক সমর্থনই নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করে।
তিনি বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের দুটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে—স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পরিবর্তে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ধর্মবিরোধী ধারা থেকে সরে এসে ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও দেশ সামগ্রিকভাবে ধর্মীয় ও ইসলামী কাঠামো শক্তিশালী করার পথে অগ্রগতি করেছে।
খামেনি বলেন, দেশকে প্রকৃত মালিক জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বন্ধ করাই ওয়াশিংটনকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। এখান থেকেই ইরানি জাতির প্রতি তাদের শত্রুতার সূচনা।
তিনি আরও বলেন, ইমাম খোমেইনি ইরানি জাতির আত্মবিশ্বাস পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। ‘আমরা পারি না’ মানসিকতার জায়গায় ‘আমরা পারি’—এই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করেন এবং পূর্ববর্তী শাসনামলে চলা অপমান ও নির্ভরশীলতার অবসান ঘটান।
ইরানের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, একসময় যা কল্পনাও করা যেত না, আজ তা বাস্তব হয়েছে—এটি সম্ভব হয়েছে জাতির আত্মবিশ্বাস ও আশার পুনর্জাগরণের কারণে।
তিনি দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ইরানের তরুণদের মধ্যে হতাশা নেই। তাদের আছে দৃঢ়তা ও আশাবাদ, আর তারাই দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে।
বক্তব্যের আরেক অংশে সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব অস্থিরতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দ্বারা পরিচালিত। এতে প্রশিক্ষিত উসকানিদাতা যেমন ছিল—যাদের কেউ কেউ অর্থ ও নির্দেশ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে—তেমনি আবেগপ্রবণ কিছু তরুণও ছিল।তিনি বলেন, অস্থিরতা উসকে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য বক্তব্যই বিদেশি হস্তক্ষেপের স্পষ্ট প্রমাণ। তবে সারা দেশে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ সমাবেশে অংশ নিয়েছে, তারাই প্রকৃত ইরানি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্রের স্বাধীন নীতি যতদিন বৈশ্বিক শক্তিগুলোর স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক থাকবে, ততদিন ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতা চলবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ভবিষ্যতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেন।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালন করেছে ঠিকই, কিন্তু জনগণের উপস্থিতিই শেষ পর্যন্ত অস্থিরতার অবসান ঘটিয়েছে—যেমনটি অতীতেও দেখা গেছে।
জাতীয় নিরাপত্তা দুর্বল করাই এই অস্থিরতার মূল লক্ষ্য ছিল বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, নিরাপত্তা ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক কিংবা সামাজিক অগ্রগতি সম্ভব নয়।
বক্তব্যের শেষাংশে আয়াতুল্লাহ খামেনি আবারও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতার মূল কারণ হলো ইরান ও তার সম্পদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। মানবাধিকারসহ অন্যান্য অভিযোগকে তিনি অজুহাত হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, ইরান কখনো আগ্রাসন শুরু করবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে—এবং ভবিষ্যতে কোনো যুদ্ধ শুরু হলে তা অনিবার্যভাবেই আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে।
রিরাইট: দৈনিক গৌরীপুরের আলো | সূত্র: IranPress










